আত্মহত্যাই জীবনের মুক্তি নয়! | আসমাউল মুত্তাকিন

0
487
আত্মহত্যাই জীবনের মুক্তি নয়! | আসমাউল মুত্তাকিন
আত্মহত্যাই জীবনের মুক্তি নয়!

‘‘এ আর নতুন কি? মৃত্যুর পর সবাই আফসোস করে হয়ত আমাকেও করবে মৃত্যুই বোধহয় মুক্তি!’’

গত ১১ই জুলাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এমন পোস্ট করে আত্মহত্যা করেন পার্বতীপুরের ভবানীপুর ডিগ্রী কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সমাপ্ত হাসান। তার বয়স আর কত হবে! এই সবে ১৯-এ পা দিয়েছিলো সে। সদা হাস্যোজ্জ¦ল একটি ছেলে ছিল সমাপ্ত। লেখাপড়ার পাশাপাশি ছাত্র-পুলিশিং কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিল সে। তার এই কর্মকাণ্ডে এলাকার মানুষ খুব খুশি ছিল। কিন্তু তার এভাবে চলে যাওয়া আসলে পরিবার, আত্নীয়-স্বজনসহ কেউ মেনে নিতে পারছিল না।

এতো গেল সমাপ্তের কথা। শুধু সমাপ্তই নয়, এভাবে জীবনের মায়া ছেড়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন বিভিন্ন বয়সী মানুষ। আর তাদের এমন মৃত্যুতে ভেঙ্গে পড়ছেন স্বজনরা। প্রতিদিনের জাতীয় দৈনিক পত্রিকা খুললে এমন অনেক সংবাদ হর-হামেশাই আমাদের চোখে পড়বে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ‘প্রিভেনটিং সুইসাইড : এ সোর্স ফর মিডিয়া প্রফেশনালস ২০১৭’-র এক জরিপে তারা বলছে, প্রতি বছর বিশ্বে ১০ লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। অর্থাৎ, প্রতি ৪০ সেকেন্ডে একটি করে আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তারা আরো একটি জরিপে বলছে, গত ৪৫ বছরে আত্মহত্যার ঘটনা ৬০ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্বে বর্তমানে ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী মানুষের মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা।

এতো গেল বিশ্বের কথা। এবার বলি বাংলাদেশের কথা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডি.এম.পি) দেশে আত্মহত্যার ঘটনার তথ্য রাখে। তাদের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশে আত্মহত্যা করেন ১০ হাজার ৭৪৯ জন। আর ২০১৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার ২৫৬ জন। বছর শেষে এই সংখ্যা নিশ্চিতভাবেই বেড়েছে। ডিএমপির গত দুই বছরের এই হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ২৯ জনের বেশি আত্মহত্যা করছেন। যাদের মধ্যে তরুণ-তরুণীদের সংখ্যাই বেশি।

প্রিয় পাঠক এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কেন মানুষ এত আত্মহত্যা করছে? বা কেন এই আত্মহত্যার প্রবণতা?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক চাপ, হতাশা, আত্মবিশ্বাসের অভাব, অবসাদ ও হেনস্থার শিকার হয়ে মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে।

এদিকে আমাদের কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ আকুল হয়ে বলেছিলেন- “মরিতে চাহি না আমি সুন্দর এ ভূবনে।” অথচ এই সুন্দর ভূবন ছেড়ে চলে যেতে অনেকেই করেন তাড়াহুড়ো, করেন আত্মহত্যা।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কেন করেন এই আত্মহত্যা?

ইতালির কবি ও ঔপন্যাসিক সেসার পাভিস এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন এভাবে, “আত্মহত্যা করবার জন্য কারোর কারণের অভাব হয় না।” তাত্ত্বিকরা এই কারণগুলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন নানানভাবে। তাই গড়ে উঠেছে একাধিক তত্ত্ব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের প্রধান ড. মো. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “আত্মহত্যার অনেক কারণ থাকতে পারে। তার মধ্যে একটি হলো- মানসিক চাপ। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু মানসিক চাপ থাকে। চাপটা বেশি হয়ে গেলে কারো কারো মনে হয়, তিনি আর সমস্যার সমাধান করতে পারছেন না। পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেন না। তখন জীবন থেকে পালানো বা আত্মহত্যার পথটাই তার কাছে সহজ মনে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “বিষন্নতায় যারা ভোগেন তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। কারণ জীবন নিয়ে তাদের মধ্যে প্রচণ্ড নেতিবাচক ধারণা কাজ করে।” সাম্প্রতিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান- “ছেলেবেলা থেকে যাদের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, তাদের মধ্যেও আত্মহত্যার প্রবণতা কাজ করে”।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আত্মহত্যা থেকে কোনো মুক্তির উপায় আছে কি ?

এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, আত্মহত্যাকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই নিজেদের ইচ্ছা সম্পর্কে পূর্বেই অন্যের কাছে (যেমন: বন্ধু-বান্ধবদের কাছে) কম-বেশী তথ্য দেয়। সেসব তথ্যকে গুরুত্ব দিয়ে, যথাযথ কাউন্সেলিং-এর মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রেই এ দূর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

মার্কিন লেখক এডওয়ার্ড ডালবার্গ বলেছেন,“যখন কেউ উপলব্ধি করে যে, তাঁর জীবনের কোন মূল্য নেই, তখন সে আত্মহত্যা করে নতুবা ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ে।”

প্রথম কথা হচ্ছে, কোন মানুষের জীবনই মূল্যহীন বা অর্থহীন হতে পারে না। তথাপি কেউ যদি তা মনে করেন-ই আমি চাইব, আত্মহত্যার পরিবর্তে তিনি ভ্রমণকেই বেছে নিবেন।

তাই আসুন, নিজের জীবনকে উপভোগ করি। নিজে সচেতন হই, অপরকেও সচেতন হতে সাহায্য করি, প্রয়োজনে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেই।

তাছাড়া আরেকটি উপায় হলো একাকীত্ব ভালো না লাগলে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ি। কে জানে, হয়তো ঘুরতে ঘুরতেই তিনি খুঁজে পাবেন জীবনের অর্থ! আত্মহত্যা করার সুযোগ তখন আর থাকবে না।

লেখক: তরুণ সাংবাদিক ও শিক্ষার্থী,
জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ (এম.আই.ইউ)।

প্রতিউত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন