মো. মামুন উদ্দীন: ভালো আছেন সবাই নিশ্চয়ই। আমি বর্ণমালা। হ্যাঁ, বর্ণমালাই বলছি। ভাষার মাসে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি নিজের কিছু অব্যক্ত কথা ব্যক্ত করতে। মর্যাদাপূর্ণ এ মাসে বর্ণমালার সাহায্যে নিজেকে প্রকাশ করব-একথা ভাবতেই রাজ্যের গৌরব, সম্মান ও মর্যাদা অনুভব করছি। তবে এ গৌরব, সম্মান ও মর্যাদার বিপরীতে আপনাদের সামনে আজ আমার কিছু দুঃখগাঁথা তুলে ধরব। মাসটা তো ফেব্রুয়ারি। আমাকে নিয়ে এ মাসে নাড়াচাড়াও একটু বেশি হবে। তাই সুযোগটা নিলাম আর-কি।

আমার জন্ম হাজারো বছর আগে। এ দীর্ঘ সময় ধরে হাজারো লক্ষ কোটি মানুষ আমার সাহায্যেই নিজেদের প্রকাশ করেছে। রচনা করেছে ইতিহাস, সাহিত্য, ললিতকলা আরও কত কী! দীর্ঘ এ সময়ে নানা চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আমি আজকের এ অবস্থানে পৌছেছি। তবে বয়স আমার নাতিদীর্ঘ হলেও আমার কোন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ছিল না। সেটাও আমি অর্জন করি ১৯৫৬ সালে। বাংলা মায়ের কিছু দামাল ছেলের জীবন, হাজারো তরুণের রাজপথ কাঁপানো মিছিল, সমাবেশের মধ্য দিয়ে আমার রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি অর্জিত হয়। সেটারও একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সুযোগ পেলে সে বিষয়ে অন্য কোনোদিন প্রকাশ করব। এজন্যই আমি পৃথিবীর বুকে অনন্য। তবে আমার পরিসর কিন্তু এখন জাতীয় সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌছেছে। আন্তর্জাতিকভাবে আমাকে এখন পালন করা হয়।

ভনিতা না করে চলুন এবার মূল কথায় ফিরে যাই। বাংলার মাধ্যমে আপনারা আমাকে প্রকাশ করলেও ভাষা দিবস কিন্তু আপনারা পালন করেন ইংরেজি শব্দ দিয়ে, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’। এটা আপনাদের একটা দ্বিচারিতা নয়-কি? আপনাদের মধ্যে কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি কি বার ও তারিখ ছিল? না, অনেকেই পারবেন না। বড়ই দুঃখ হয় আপনাদের জন্য!

রাষ্ট্রের সর্বস্তরে এককভাবে আমাকে চালু করার কথা থাকলেও আপনারা তা এখনও করতে পারেননি। আদালতের ভাষা এখনও ইংরেজি। চিকিৎসকের লেখার ভাষা বাংলা হওয়ার কথা থাকলেও অনেক চিকিৎসকই তা মানেন না। ইংরেজি মাধ্যমের অনেক শিক্ষার্থী মায়ের ভাষায় কথা বলতে সঙ্কোচ বোধ করেন। হালের শিশুরা আমার চেয়ে হিন্দিকেই প্রাধান্য দিচ্ছে বেশি। বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাদান পদ্ধতি এখনও পুরোপুরিই ইংরেজি। আমাকে নিয়ে এতসব রাষ্ট্রীয় স্বেচ্ছাচারের শেষ কোথায় বলতে পারবেন কেউ?

স্বাধীনতার পর এতগুলো বছর পার হয়ে গেলেও আপনারা এখনও অভিন্ন বানানরীতি চালু করতে পারলেন না। বাংলা একাডেমি প্রমিত বানানরীতি চালু করলেও তা কেউ মানছে, আবার কেউ মানছে না। একদেশে এতগুলো বানানরীতি থাকে কি করে-সেটা আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন?

বাধ্যতামূলক অভিন্ন বানানরীতি না থাকার ফল কী হচ্ছে কিছু উদাহরণ দিলে আপনারা তা বুঝতে পারবেন। আপনাদের অনেকেই পোশাক শব্দটি বানান করেন পোষাক অর্থাৎ ‘ষ’ দিয়ে। কার্যালয়কে লিখেন ‘কার্য্যালয়’, ভুলকে ‘ভূল’, মডার্নকে ‘মডার্ণ’, গভর্নরকে ‘গভর্ণর’, মাস্টারকে ‘মাষ্টার’, জার্মানিকে ‘জার্মানী, শ্রেণিকে ‘শ্রেণী’ অঙ্ককে ‘অংক’ হিসেবে। এরকম উদাহরণ দিলে আরও হাজারো দেওয়া যাবে।

আমি জানি, এ মাসে আমার জন্য আপনাদের অনেকের মন কাঁদবে। অনেকের দরদ উতলে উঠবে। সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু করার জন্য আপনারা সভা-সেমিনার করবেন। ৮ ফাল্গুন তারিখটিকে আপনারা ঘটা করে পালন করবেন। গণমাধ্যমে লেখালেখি করবেন, অনুষ্ঠান করবেন। ফেব্রুয়ারি শেষ। আপনারা আবার অতিরিক্ত ফোলা বেলুনের মতোই ফুটে চুপসে যাবেন। বাকি এগারো মাসের জন্য শীতনিদ্রা যাপন করবেন। এভাবে আর কতদিন চলবে, বলেন?

লেখক: বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
জার্নালিজম এন্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ

প্রতিউত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন