ঈদ-উল-ফিতর : তাকওয়া অনুশীলনীর সমাপনী উৎসব

0
340
ঈদ-উল-ফিতর

ডক্টর মোহাম্মদ ইদ্রিস: ঈদ মুসলমানদের জাতীয় চেতনার প্রধান উৎসব। প্রতি বছর অনাবিল আনন্দ ও খুশীর বার্তা নিয়ে যখন ঈদ আগমন করে, তখন খুশীর জোয়ারে ভেসে উঠে সমগ্র মুসলিম জাহান। রমযানুল মুবারকের সিয়াম পালন, লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রি জাগরণ এবং ইতিকাফের পর রমজানের শেষ দিবসের সন্ধায় পশ্চিম আকাশের কালো মেঘ চিঁড়ে যখন একফালী চাঁদ উদিত হয় তখন চারিদিকে ধ্বনিত হয় আমাদের জাতীয় কবির ভাষায় ‘ও মন রমযানের রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ। তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাকিদ….।’ ধনী, দরিদ্র, ইয়াতিম, মিসকিন সবার ঘরে ঘরেই ঈদের আনন্দ যেন, আল্লাহ তা’য়ালা প্রদত্ত একটি জান্নাতী পরিবেশ। সুদীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে প্রকৃতি ভরে যায় আনন্দ-কোলাহলে, ভ্রাতৃত্ব ও প্রেমের সৌরভ বিতরণে। বয়ে আনে আনন্দের এক বেহেশতি সওগাত। ঈদ ধনী-গরিব সব মানুষের মহামিলনের বার্তা বহন করে। এক কাতারে দাঁড়িয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের একসঙ্গে নামাজ আদায়ের সুযোগ এনে দেয় ঈদ। ঈদের খুশির এক অন্যতম উপকরণ হচ্ছে ঈদের দুই রাকাত ওয়াজিব নামাজ। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ঈদের নামাজ আদায়ের পর ঈদগাহ ময়দানে একে অপরের হাতে হাত, বুকে বুক রেখে আলিঙ্গন করলে মুসলমানরা সারা মাসের রোজার কারণে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট ভুলে যায়। সমাজের সর্বস্তরের মুসলিম জনতা ঈদের নামাজের বার্ষিক জামাতে সানন্দে উপস্থিত হয়।

ঈদ শব্দটি আরবি। অর্থ খুশি, আনন্দ, অনুষ্ঠান, উৎসব, পর্ব ইত্যাদি। শব্দের মূল রূপ হলো আওদ, যার অর্থ ফিরে আসা। লিসানুল আরব অভিধানে রয়েছে, আরবদের কাছে ঈদ বলা হয় এমন সময়কে, যে সময় আনন্দ ও দুঃখ ফিরে আসে। আল মুহিত অভিধানে রয়েছে, যে রোগ, দুঃখ, দুশ্চিন্তা বা অনুরূপ কোনো কিছু বারবার ফিরে আসে তাকে ঈদ বলা হয়। আল মুনজিদ অভিধানে বলা হয়েছে, ঈদ এমন দিনকে বলা হয়, যাতে লোকজনের সমাগম হয় বা কোনো সম্মানিত ব্যক্তি অথবা গুরুত্বপূর্ণ কোনো ঘটনার স্মৃতিচারণা করা হয়। ঈদ প্রতিবছর সাজগোজ, আনন্দ-খুশি ও নতুন পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে ফিরে আসে। এ কারণে ঈদের দিনকে আনন্দ ও খুশির দিন বলা হয়। অভিধানে বলা হয়েছে, ঈদকে এ জন্য ঈদ বলা হয় যে তা প্রতিবছর নতুন আনন্দ ও খুশি নিয়ে ফিরে আসে। কোরআন মজিদেও ঈদ শব্দের ব্যবহার রয়েছে; যেমন:মরিয়ম তনয় ঈসা বলল, হে আল্লাহ! আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জন্য আসমান থেকে খাদ্যপূর্ণ খাঞ্চা প্রেরণ করুন, তা আমাদের ও আমাদের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সবার জন্য হবে ঈদ-আনন্দোৎসব এবং আপনার পক্ষ থেকে একটি নিদর্শন (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ১১৪)। এই আয়াতে আসমানি খাদ্য নাজিল হওয়ার দিনটি পরবর্তীদের জন্য স্মৃতিচারণার দিন হওয়ায় তাকে ঈদ বলা হয়েছে।

ঈদের দিনের অশেষ ফজিলত ও সম্মানজনক মর্যাদা সম্পর্কে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘ঈদুল ফিতরের দিন ফেরেশতারা রাস্তার মুখে মুখে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে থাকেন: হে মুসলিম! নেককাজের ক্ষমতাদাতা ও সওয়াবের আধিক্যদাতা আল্লাহর কাছে অতি শিগগির চলো। তোমাদের রাতে ইবাদত করার হুকুম করা হয়েছিল, তোমরা তা করেছ, দিনে রোজা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তোমরা তা পালন করেছ। তোমরা তোমাদের সৃষ্টিকর্তাকে খাইয়েছ (অর্থাৎ গরিব-দুঃখীদের আহার দিয়েছ) আজ তার পুরস্কার গ্রহণ করো। অতঃপর মুসলমানরা যখন ঈদের নামাজ পড়ে তখন একজন ফেরেশতা উচ্চ স্বরে ঘোষণা করেন, তোমাদেরকে তোমাদের সৃষ্টিকর্তা ক্ষমা করে দিয়েছেন। এখন তোমরা তোমাদের পুণ্যময় দেহ-মন নিয়ে নিজ নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন কর। এ দিনটি পুরস্কারের দিন, আকাশে এই দিবসের নাম “উপহার দিবস” নামে নামকরণ করা হয়েছে।’ (তাবারানি)

সমাপনী উৎসব

ঈদু-উল-ফিতরের ইতিকথা: মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা:) এর মদীনায় হিজরতের পরেই ঈদ-উল- ফিতরের উৎসব পালন শুরু হয়। হযরত আনাস (রা:) হতে বর্ণিত একটি হাদীস থেকে জানা যায়, নবী কারীম (সা.) হিজরত করে মদীনায় এসে দেখতে পান যে, মদিনাবাসীগণ শরতের পূর্ণিমায় ‘নওরোয’ এবং বসন্তের পুর্ণিমায় ‘মিহিরজান’ নামে দু’টি উৎসব পালন করে। এ দু’টি উৎসবে তারা বিভিন্ন ধরণের আনন্দ-আহলাদ,খেলা-ধূলা এবং অশ্লীল কূ-রুচিপূর্ণ রং তামাসার মাধ্যমে উদযাপন করতো। উল্লেখিত উৎসব দু’টির রীতি-নীতি, আচার-ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণরুপে ইসলামের পরিপন্থি। শ্রেণী-বৈষম্য, ধনী-দরিদ্রের মধ্য কৃত্রিম পাথক্য, ঐশ্বর্য-অহমিকা ও অশালীন কর্মকান্ডে পরিপূর্ণ এই উৎসব উদযাপন প্রক্রিয়ায় ব্যথিত হলেন মহানবী (সা:)। মহানবী (সা:) ঘোষণা করলেন ‘আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের জন্য এ দু’টি দিবস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ ও মহিমাময় দু’টি দিবস তোমাদের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছেন। আর পূণ্যময় দিবস দু’টি হলো ঈদ-উল- ফিতর ও ঈদ-উল- আযহা। অতএব, পূর্বের উৎসব দু’টি বন্ধ করে ঈদ-উল- আযহার নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদী পালন করো’। (সুনানে আবু দাউদ) ইসলামী আদর্শে উজ্জীবিত আরববাসী শুরু করল ঈদ-উল ফিতর ও ঈদ-উল আযহার উৎসব পালন। শ্রেণী-বৈষম্য বিবর্জিত পঙ্গিলতা ও অশালীনতামুক্ত সুনির্মল আনন্দ উপভোগ শুরু হল ঈদ-উল ফিতরের পূর্ণময় দিবসে। মুসলিম জাতির মাঝে জন্ম নিল একটি সুস্নিগ্ধ, প্রতিঘন মিলন উৎসব ঈদ-উল ফিতর।

ঈদ-উল ফিতরের অর্থ ও তাৎপর্য: পবিত্র রমজান মাসের সিয়াম সাধনা, সংযম পালন ও শৃংখলাময় জীবন-যাপন শেষে প্রতিটি মুসলমানের ঘরে ঘরে ঈদের শুভ ও হাস্যস্নিগ্ধ আগমন ঘটে। মাহে রমজানের আগমনী বার্তা ছিল তাকওয়া অর্জনের মাধ্যমে হিসেবে। পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে ‘হে ঈমানদারগণ তোমাদের জন্য রোযাকে ফরয করা হয়েছে। যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্বপবর্তীদের জন্য, যেন তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’ (সুরা বাকারা:১৮৩) কুরআনুল কারীমের এ ভাষ্যমতে ঈদ-উল ফিতর হলো তাকওয়া বা আল্লাহ ভীতির অনুশীলনীর সমাপনী উৎসব। আল্লাহর নির্দেশে দীর্ঘ একমাসব্যাপী সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমরা যে তাকওয়া ভিত্তিক চরিত্র গঠনের অনুশীলন করে থাকি, তার সমাপনী উৎসব ঈদ-উল-ফিতর নামে অভিহিত।

ফিতর অর্থ হলো ‘উপবাস ভঙ্গকরা’ না খেয়ে থাকার পর খাবার গ্রহণ করা। Break-fast বলতে যা বুঝায়, আরবী ফিতর যা ফুতুর অর্থ প্রকৃত পক্ষে তাই। আত্মসংযমের শক্তি অর্জনের জন্য দীর্ঘ একমাসব্যাপী রমজানুল মুবারকে একটি মহড়ায় আমরা অংশ গ্রহণ করি। আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে এ ভাবে আত্মসংযমের ও আত্মশুদ্ধির উদ্দেশ্যে নির্ধারিত একটি কোর্স সমাপ্তির পর আবার দিবাভাগে আহার গ্রহনের অনুমতি আসে। কোর্স সমাপ্তির পরের দিনের উৎসবটি নিসক খাবার সুযোগকে কেন্দ্র করে নয় বরং এ মাসের নির্দিষ্ট কোর্স সাফল্যে সাথে সমাপ্তির আনন্দই এখানে প্রধান। এ আনন্দের প্রকাশ ঘটে ঈদ-উল ফিতরে তাকওয়া বা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের ঘোষণা ও দু’রাকা‘য়াত নামাযের মাধ্যমে। তাই সমবেত জনতার ধ্বনিতে মুখরিত হয় ঈদগাহ ময়দান- ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লালাহু আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ্।’

ঈদ মুসলিম জাতির জন্য কোন নিছক নাচ-গানের মজমা তথা আনন্দ উল্লাসের মহড়া নয়। যেমন কেউ বা কোন জনসমষ্টি বাইরে বিশেষ কোন প্রশিক্ষণের জন্য ক্যাম্পে আটকা থাকার পর ছুটির জন্য যে অনুষ্ঠান হয় এবং সেখানে সবার যে মানসিক অনুভূতি হয় পবিত্র মাহে রমযানের সিয়াম পালনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ শেষে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার অনুভূতিও একজন মানুষের তাই হয়ে থাকে। মূলত: কোন প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে গিয়ে শিক্ষার্থীরা যে প্রশিক্ষণ লাভ করে থাকে তা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যথাযথভাবে বাস্তবায়নই হলো উক্ত প্রশিক্ষণের প্রকৃত দাবী, সেভাবে রমযানুল মুবারকের সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রোযাদার যে প্রশিক্ষণ লাভ করেছে তা বাস্তব জীবনে যথাযথভাবে রূপায়িত করলেই কেবল রোযার আবেদন সার্থক হতে পারে। ‘সাওম’ অর্থ বিরত বা থামিয়ে দেয়া। মানুষকে স্বাভাবিক জীবন তথা পানাহার থেকে থামিয়ে দিয়ে আল্লাহর হুকুম পালনের বাস্তব প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করানোই সিয়ামের উদ্দেশ্য। আর এ বিরতির আনুষ্ঠানিক ভঙ্গের অনুষ্ঠান মাহে শাওয়ালের ১লা তারিখের ঈদ-উল ফিতর। সিয়াম যেমন মুসলমানের দৈহিক সাদকার আনুষ্ঠানিকতা হয় তেমনি সিয়াম পালনকারীর আর্থিক ব্যয়ের বিধানের কারণেই সাদাকায়ে ফিতরার কথা বলা হয়েছে। সকল সক্ষম মুসলিমকেই তার পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য মাথা পিছু নির্দিষ্ট হারে ফিতরা গরীব, দুস্থ, মিসকিন ব্যক্তিদেরকে এ জন্য দিতে হয় যেন তারা অদ্যকার ঈদে সচ্ছল তথা ধনাঢ্য ব্যক্তিদের সাথে শামিল হতে পারে। ফিতরা প্রদান ইসলামী শরীয়ায় একটা সাধারণ বিধান হিসেবে মুসলিম সমাজে কার্যকর রয়েছে। এটা ধনীদের জন্য গরীবদের ওপর নিছক কোন দয়া বা করুণা নয় বরং এটা ধনীদের নিকট থেকে গরীব তথা বঞ্চিতদের একটা হক বা অধিকার যার অর্থ কর্তৃত্ব বা ক্ষমতাও বলা যেতে পারে।

‘ফিতর’ শব্দের অপর অর্থ হলো সৃষ্টি, শব্দটি কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন জায়গায় উল্লেখ রয়েছে। যেমন পুরোহিত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেও আল্লাহপাকের অনুগ্রহে হযরত ইবরাহিম (আ:) ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি একে একে তারকা, চন্দ্র ও সূর্য সবকিছু অস্বীকার করে সকল সৃষ্টির স্রষ্টা ও মালিক আল্লাহপাককে উপলদ্ধি করে ঘোষণা প্রদান করলেন: ‘আমি সবকিছু থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর আনুগত্যে নিজেকে নিয়োজিত করলাম, যিনি আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত নই।’ (সূরা আল আন‘আম: ৭৯) এখানে ‘ফাতারা’ অর্থ সৃষ্টি করা। ঈদ-উল-ফিতর অর্থ যদি সৃষ্টির খূশী হয়, তা হলেও বলা যেতে পারে যে, দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে কঠোর আত্মসংযম, আত্মশুদ্ধি, সহমর্মিতা তথা তওবা ইস্তেগফারের অনুশীলন ও প্রশিক্ষণ শেষে নতুনভাবে মুসলমানদের জীবন প্রবাহ শুরু হয়। মানুষ আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব পালনের উদ্যমে মেতে ওঠে এ যেন ধ্বংস তথা পতনের পরিবর্তে সমাজ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্বচ্ছ সৃষ্টির দৃঢ় অঙ্গীকারে উজ্জীবিত হয়ে উঠে। এ অর্থেও এ ঈদকে ঈদ-উল-ফিতর বলা যথার্থ হতে পারে।

ঈদ-উল-ফিতর একটি কৃতজ্ঞতা স্বীকার অর্থাৎ আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের অনুষ্ঠান মাত্র। কোন ব্যক্তি অন্য কোন ব্যক্তি বিশেষের কাছে কোন উপকার পেলে স্বভাবতই উপকৃত ব্যক্তি উপকারীর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকে। দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনায় মহান রাব্বুল আ’লামীনের রহমত, মাগফেরাত ও জাহান্নাম থেকে মুক্তির এবং পবিত্র লাইলাতুল ক্বদরের রাত্রে হাজার মাসের অধিক এবাদতের সৌভাগ্য অর্জনের সুযোগ লাভের জন্য মহান রাব্বুল আ’লামীনের দরবারে শুকিয়া আদায় এবং তাঁর নিকট নিজকে আত্মসমর্পণের আনুষ্ঠানিকতাই হলো পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের প্রকৃত শিক্ষা। ঈদ-উল-ফিতর ও ঈদ-উল-আযহার দিন আনন্দের সুচনাটাই হলো মহান রাব্বুল আ’লামীনের বিরাটত্ব, মহানত্ব ও তাঁর নিরঙ্কুশ সার্বভৌমত্বের ঘোষণামূলক বাক্য সম্ভার তথা তাকবীর, তাসবিহ তেলাওয়াতের মাধ্যমে। আর এ তাকবীর উচ্চারণ করতে করতে মুসলমানগণ ঈদগাহের দিকে রওয়ানা হয় দু’রাকা‘য়াত সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে। এ সালাতটাও এককভাবে নয় সবাইকে সম্মিলিতভাবে। একমাস সিয়াম সাধনার পর ঈদের খুশীতে অংশ গ্রহণের আসল দাবী হলো বিগত জীবনের পাপ পঙ্কিলতা থেকে মুক্তির আনন্দে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীনের শুকরিয়া আদায় করা। যদি সিয়াম বা রোযা নিছক উপবাসের আনুষ্ঠানিকতা হয় তাহলে এর মধ্যে কল্যাণ থাকতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি রোযা রেখে অশ্লীলতা, মিথ্যাচার ও তদানুযায়ী কার্যক্রম ত্যাগ করতে পারলো না তার খাদ্য ও পানীয় ত্যাগ করায় আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালার কোন প্রয়োজন নেই।’ (বুখারী)

একদা পবিত্র ঈদ-উল-ফিতরের দিন আমীরুল মু‘মিনিন হযরত ওমর ফারুক (রা:) ঈদের খুশীতে অংশগ্রহণ না করে বাড়ীতে বসে কাঁদছিলেন। তা দর্শনে সহকর্মীগণ কারণ জিজ্ঞাসা করলে হযরত উমার ফারুক (রা:) বলেছিলেন যে, মাহে রমযান চলে গেছে অথচ আমার পাপসমূহ ক্ষমা হয়েছে কিনা আমি জানি না, কাজেই কোন নিশ্চয়তার ভিত্তিতে আমি ঈদুল ফিতরের খুশীতে অংশগ্রহণ করবো? যাদের পাপসমূহ ক্ষমা করা হয়েছে বলে নিশ্চয়তা পেয়েছে তারা আজকের ঈদের খুশীতে অংশ গ্রহণ করুক। মূলত: ঈদ-উল-ফিতরের আনন্দ উৎসব আল্লাহ সুবহানাহু তা’য়ালার নিকট সিয়াম পালনকারীদের ইস্তেগফার কামনা আল্লাহর শুকরিয়া আদায়, বিনয়, নম্রতা ও আনুগত্য প্রদর্শনের আনুষ্ঠানিকতা ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

যারা যথাযথভাবে মাহে রমযানের রোযা ঈমান ইহতেছাবের সাথে পালন করতে পেরেছে, কিয়ামূল লাইল, ইতিকাফ, লাইলাতুল ক্বদরে যথাযথ ইবাদতে অংশগ্রহণ করতে পেরেছে সর্বোপরি মহান রাব্বুল আ’লামীনের নিকট তা গৃহীত হয়েছে, তাদের সম্পর্কে হাদীসে কুদসীতে এসেছে- মহান রাব্বুল আ’লামীন বলেন, ‘ক্বলা রাসুল (সা.) কানা ইয়ামু ঈদেহিম রাহাবিহিম মালাইকাহ ফাকালা ইয়া মালাইকাতি মা জাযায়াহুম আযিরিন ওয়াফ্ফা আমালাহু কালু জাযাউহুম আই ইউরদা আখারাহু কা’লা ইয়া মালাইকাতি আরিদি ওয়া ইমাই ফাদাউ ফারিদাতি আলাইহিম, ছুম্মা খারাজু ইযাউযুনা ইলাদ্দোয়া” অর্থাৎ মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন যখন ঈদের দিন উপস্থিত হয় এবং সবাই আল্লাহর তাসবিহ করতে করতে ঈদে সমবেত হয়, আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন ফিরিস্তাদেরকে বলেন, হে ফেরেস্তাগণ যারা তাদের কার্যক্রম যথাযথ পালন করে তাদের বিনিময় কি হতে পারে? ফিরিস্তাগণ উত্তরে বলে, এখন তাদের যথাযথ মুজরিটাই প্রাপ্য। প্রত্যুত্তরে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন বলেন, তাদের উপর যা নির্ধারিত ছিল তা পরিপূর্ণভাবে আদায় করেছে অত:পর আমার তাসবিহসহ বাড়ী থেকে বের হয়েছে এবং আমার গৌরব, মহত্ত ও শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করেছে। এক্ষেত্রে আমি তাদেরকে বলবো যাও তোমাদেরকে মাফ করে দেয়া হলো। (আল-হাদীস)

আমাদের সমগ্র মুসলিম জাতিকে আল্লাহ রাব্বুল আ’লামীন তাঁর বিধানাবলী যথাযথ পালন ও প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ঈদের খুশিতে অংশগ্রহণের তাওফিক দান করুন। ঈদের এই অনাবিল আনন্দের ফুয়ারা প্লাবিত করুক মুসলমানদের প্রতিটি মুহুর্তকে এ প্রার্থনাই করি মহান রবের দরবারে। আমিন ॥

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাঁথিয়া মহিলা ডিগ্রি কলেজ, সাঁথিয়া,পাবনা।

প্রতিউত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন