গণমাধ্যম কি আসলেই স্বাধীন?

0
387

আজ সাংবাদিকদের জন্য বিশেষ একটি দিন। আজ ৩ মে, ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম ডে’ বা ‘বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস’।

গণমাধ্যম বা সংবাদপত্রকে বলা হয় রাষ্ট্রের ৪র্থ স্তম্ভ । জ্ঞানের ভান্ডার। আবার বলা হয় সভ্যতার অগ্রদূত ও সৃজনশীল প্রতিভাধর সমাজের সম্মানিত ব্যাক্তি।

এদিকে সারা বিশ্বে যখন মুক্ত গণমাধ্যম দিবস পালিত হচ্ছে, তখন বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যমের ওপর চাপ ও ভয়ভীতি আমাদের যারপরনাই উদ্বিগ্ন করে।

মত প্রকাশের স্বাধীনতা পর্যবেক্ষণ করে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের জরিপ এবং মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে সারা বিশ্বেই গণমাধ্যমের ঝুঁকি বেড়ে চলেছে।

আর যেসব দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হচ্ছে, তার মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশ গত বছরের তুলনায় এবছর আরও এক ধাপ পিছিয়েছে।

গত ২০ এপ্রিল রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ২০২১ সালের এই সূচক প্রকাশ করে। ২০১৯ সাল থেকে প্রতিবছর সেই সূচকে এক ধাপ করে পেছাচ্ছে বাংলাদেশ।

সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। সূচকে সবার শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে। ২০২০ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫১তম। আর ২০১৯ সালের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫০তম। অর্থাৎ, গতবারের সূচকেও বাংলাদেশের এক ধাপ অবনতি হয়েছিল।

এবারের সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সবার নিচে। বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে পাকিস্তান (১৪৫), ভারত (১৪২), মিয়ানমার (১৪০), শ্রীলঙ্কা (১২৭), আফগানিস্তান (১২২), নেপাল (১০৬), মালদ্বীপ (৭৯), ভুটান (৬৫)।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণমাধ্যম কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছে, তার ভিত্তিতে ২০০২ সাল থেকে আরএসএফ এই সূচক প্রকাশ করে আসছে। (বাংলা ট্রিবিউন)

এদিকে বাংলাদেশে যারা গণমাধ্যমের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা অনেকেই বলছেন, এরপরও মুক্ত গণমাধ্যম সম্ভব। আমরা সাংবাদিকতার দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছি। এটাকে চাকরি হিসেবে নেইনি। দায় আমাদের, সমাধানের দায়িত্বও আমাদের। অন্য কেউ সমাধান এনে দেবে না।

কিন্তু প্রশ্ন হলো এই যে গণমাধ্যমের ফ্রিডম বা স্বাধীনতা, এটা কার? সংবাদমাধ্যমের? গণমাধ্যমকর্মীর? নাকি গণমাধ্যম মালিকের? এই তিন শ্রেণিই যে এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট! এর জবাবও স্পষ্টভাবে দেওয়া আছে গত বছর (২০ইং) গণমাধ্যম দিবস উপলক্ষ্যে ঘোষিত ইউনেসকোর নীতিমালায়।

নীতিমালা অনুযায়ী, ‘আদর্শিকভাবে স্বাধীনতা থাকতে হবে সংবাদের ও সংবাদকর্মীর।’ স্পষ্ট করে বলতে গেলে, ‘যেকোনো সংবাদ পরিবেশনে কোনো চাপ, ভয়-ভীতি বা আনুকূল্যের শিকার না হয়ে অবিকৃতভাবে প্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতাই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা।’

কিন্তু আমাদের দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গেলে এই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অনেকটাই মালিকের পকেটে পুরে রাখা। সংবাদকর্মীরা এখানে কেবল ‘হুকুমের চাকর’।

অন্যদিকে বিজ্ঞাপন ও করপোরেট স্বার্থের এই বিশ্বে গণমাধ্যমের মালিকের স্বাধীনতাও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত হয় বিজ্ঞাপনদাতাদের ইচ্ছায়।

আর গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষার বিষয়টি তো অনেকাংশেই সরকারের ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল।

এতকিছুর পরও জনগণের আস্থা, ভরসার ঠিকানায় এক মাত্র গণমাধ্যম। গণতান্ত্রিক অনেক প্রতিষ্ঠানের অকার্যকারিতার বিতর্কের মাঝে গণমাধ্যম টিকে আছে মতপ্রকাশের সুযোগের কারণেই।

এই সুযোগপ্রাপ্তির জন্য প্রাত্যহিক লড়াইয়ে সামনের সারির যোদ্ধা কিন্তু সাংবাদিকরাই। আর এই মত প্রকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাটা সাংবাদিকের মুল লড়াইয়ের জায়গা।

‘জার্নালিজম ইজ নট আ ক্রাইম’— এই এক আপ্তবাক্যকে পুঁজি করে সংবাদপ্রকাশ ও প্রচারের স্বাধীনতা এবং মতপ্রকাশের অধিকারের প্রশ্নে নিয়ত লড়াই সংবাদকর্মী, মালিক এবং সর্বোপরি গণমাধ্যমের।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে মুক্ত সাংবাদিকতা করতে যারা চান এবং যারা এই বিষয়ে সংগ্রাম করে যাচ্ছেন সবাইকে অভিবাদন জানাই।

গ্রন্থনা: আসমাউল মুত্তাকিন
শিক্ষার্থী এবং গণমাধ্যমকর্মী

প্রতিউত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন