Monday, October 3, 2022
Homeবিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবাটারফ্লাই ইফেক্ট

বাটারফ্লাই ইফেক্ট

লিখেছেনঃ মোঃ ফখরুল ইসলাম রোমান

ইদানীংকালে খুব করে বাটারফ্লাই ইফেক্টের নাম শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ এই বিষয়ে জেনে থাকলেও অনেকেই হয়তো বাটারফ্লাই ইফেক্ট সম্পর্কে বিস্তারিত জানিনা। বাটারফ্লাই ইফেক্ট (Butterfly effect, “প্রজাপতির প্রভাব”) বলতে বোঝায় কোনো ক্ষুদ্র ঘটনার ফলে ভবিষ্যতে এর বৃহদাকার প্রভাব সৃষ্টি।

তারমানে বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর মূল কনসেপ্ট হচ্ছে- কোনো একটি স্থানের ছোট একটি পরিবর্তন পরবর্তীকালে অন্য কোনো জায়গার বড় ধরনের ঘটনার জন্য দায়ী হতে পারে।

আমি যদি আপনাকে বলি, আপনি মিস ইউনিভার্স হারনাজ সান্ধু’র সাথে সম্পর্কযুক্ত, অথবা মেসির এবারের বেলন ডি’অর জয়ের পেছনে আপনার বাবার প্রভাব রয়েছে; তাহলে কি খুব বেশি আশ্চর্য হবেন?!

আশ্চর্য হওয়ার কিছই নেই। উপরের ঘটনাগুলো কাল্পনিক হলেও এ কথা শতভাগ সত্য যে – এই পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ একে অপরের কাজের মাধ্যমে কোন না কোন ভাবে প্রভাবিত। এই তত্ত্বটি কে “Theory of Chaos” বা “বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব” বলে। এই Theory of Chaos বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্বের একটি  ফলাফল হচ্ছে বাটারফ্লাই ইফেক্ট।

 

 

তাহলে মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে Theory of Chaos বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব কি?

Theory of Chaos বা বিশৃঙ্খলা তত্ত্ব নিয়ে অনেক ধরণের পাওয়া গেলেও সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন মার্কিন গনিতবিদ এডওয়ার্ড নর্টন লরেঞ্জ (Edward Norton Lorenz). লরেঞ্জ গানিতিকভাবে বিশ্লেষণ করে দেখান যে, বিশ্বের যে কোন তরঙ্গের সামান্য পরিবর্তন করা হলে সেই পরিবর্তন বিশ্বের সকল তরঙ্গ কে উল্লেখযোগ্য ভাবে পরিবর্তন করে। এ বিষয়টি Superposition of wave বা  তরঙ্গের উপরিপাতন দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায়। তিনি উদাহরণস্বরূপ বলেছিলেন, ব্রাজিলে কোন প্রজাপতি ডানা ঝাপটালে তার ফলস্বরূপ যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসে হারিকেন হতে পারে। ভয়ের কারণ নেই।  তিনি আসলে বোঝাতে চেয়েছেন যে, যে কোন ক্ষুদ্র কাজের পরিণতি অনেক বড়ও হতে পারে।

তারমানে কোন ছোট অথবা সামান্য কাজকে গুরুত্বহীন মনে না করা। আমাদের আশেপাশের বিভিন্ন মানুষের ছোটখাটো বা আপাতদৃষ্টিতে গুরুত্বহীন কাজও কোন ফলাফলকে বিশেষভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে। এবার কিছু উদাহরণে নজর দেয়া যাক।

১. ভুল দয়া (Wrong Mercy)

Wrong Mercy বা ভুল দয়া বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর সবচেয়ে জনপ্রিয় উদাহরণ। ১৯১৮ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর, বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। সেদিন জার্মানি ও ব্রিটেনের মুখোমুখি যুদ্ধের এক পর্যায়ে হেনরি টেন্ডেন নামের এক ব্রিটিশ সেনার বন্দুকের নিশানায় এর আহত জার্মান সৈনিক এসে পড়ে। হেনরি চাইলেই জার্মান সৈনিকটিকে গুলি করতে পারতো। কিন্তু দয়া দেখিয়ে গুলি করেননি। সেই দয়াপ্রাপ্ত সৈনিকটিকে আজ আমরা “এডলফ হিটলার” নামে জানি। সেই ব্রিটিশ সেনা সেদিন যদি দয়া না দেখাতো, তাহলে কি হতো কেউ জানে না। যদি সে দিন ব্রিটিশ দেনা হিটলারকে গুলি করে দিতেন তাহলে কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতো?

পারমানবিক বোমা কি আবিষ্কার হতো?! এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি, যাবেও না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যে পুরো বিশ্বে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে তা কেউ অস্বীকার করতে পারেনা। বিশ্বযুদ্ধের ফলে ইউরোপের অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের ফলে দীর্ঘদিন উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ব্রিটিশ সরকার পূর্বের মতো সামলাতে পারেনি। যার ফলে জন্ম হয় ভারত ও পাকিস্তানের; পরবর্তিতে জন্ম হয় বাংলাদেশের। এখন প্রশ্ন এসেই যায়, যদি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না হতো তাহলে কি উপমহাদেশ স্বাধীন হত?!

বাংলাদেশের জন্ম হত? যদিও হতো তাহলে কি এসব ঘটনা এমনই থাকতো?!

২. তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধঃ

ভাবছেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ কিভাবে বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর উদাহরণ হয়?! আশ্চর্য হলেও সত্য যে, বাটারফ্লাই ইফেক্ট দেখা যায় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের সম্ভাবনাতেও। ১৯৬২ সালে কিউবান মিসাইল সংকটের সময় তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়েই যেত, যদি না শেষ মুহুর্তে বুদ্ধিমত্তার সঠিক প্রয়োগ না হতো। সেই সময় এক বিশেষ ভুল বোঝাবুঝির জন্য সোভিয়েত সাবমেরিন টর্পেডো লঞ্চ করতে প্রস্তুত ছিলো মার্কিন যুদ্ধজাহাজের উদ্দেশ্যে। সোভিয়েন নিয়ম অনুযায়ী সাবমেরিন টর্পেডো লঞ্চের জন্য ক্যাপ্টেন, পলিটিকাল অফিসার এবং সেকেন্ড ইন কমান্ড অফিসার, এই তিন পদস্থ প্রত্যেক ব্যাক্তির সম্মতি দরকার। কিন্তু বাকি দু’জন সম্মতি দিলেও সেকেন্ড ইন কমান্ড অফিসার সম্মতি দেন নি।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ নোট হচ্ছে, তখনকার সময় সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উভয়েই পারমানবিক শক্তিসম্পন্ন দেশ ছিল। তখন যদি এই দুই পরাশক্তি যুদ্ধে নেমে যেতো তাহলে পারমানবিক বোমার ব্যাবহার অনিবার্য ছিল। যার ফল হতো কল্পনাতীত ভয়াবহ। এমন কি পৃথিবী থেকে মানুষের অস্তিত্ব বিলীন ও হয়ে যেতে পারতো।

এভাবেই অনেক ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কাজ আমাদের ভবিষ্যৎ এবং সভ্যতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

এরকম আরো অনেক অনেক উদাহরণ আছে বাটারফ্লাই ইফেক্ট এর। সুতরাং, পরবর্তিতে যদি কোন আকস্মিক ঘটনা আপনার সাথে ঘটে, তাহলে সেটাকে নিছক ঘটনা না ভেবে কারো না কারো কাজের ফল ভাবাই যুক্তিসংগত হবে।

RELATED ARTICLES

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Most Popular

Recent Comments