ভার্চুয়াল জগত : সম্ভাবনা ও শঙ্কা

0
537
ভার্চুয়াল জগত : সম্ভাবনা ও শঙ্কা
ভার্চুয়াল জগত : সম্ভাবনা ও শঙ্কা

আলহাজ্জ্ব আবু ইউসুফঃ   পর্ব-১ :
যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের সুবাদে মানব সমাজ প্রবেশ করেছে নতুন এক জগতে, যার নাম ভার্চুয়াল জগত। বাস্তব জগতের সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন সংযোগের মধ্য দিয়ে এ জগত সমৃদ্ধ হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ফলে আরো গতিময় হয়ে উঠছে মানব জীবন।

ইন্টারনেট কেন্দ্রিক এ জগতে সময়ের সীমাবদ্ধতা নেই। রাত-দিনের বিভাজন নেই। সত্যিকার অর্থেই ভার্চুয়াল জগত স্থান ও সময়ের প্রচলিত ধারণাকে পাল্টে দিচ্ছে। এই জগতের কল্যাণে বিশ্বের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে নিমিষেই। এক সময় যা ছিল অকল্পনীয়। এসব কারণে বর্তমান বিশ্ব-ব্যবস্থাকে আর পুরনো মানদ- ও কাঠামোর ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। তবে ভার্চুয়াল জগত নানা সুযোগ ও সম্ভাবনা সৃষ্টির পাশাপাশি বিভিন্ন সংকটেরও জন্ম দিয়েছে। নানা বৈশিষ্ট্যের কারণে যোগাযোগের ধরণ ও মডেলে পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো মানুষের বাস্তব জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরতার কারণে মানুষের আচার-আচরণেও পরিবর্তন আসছে। এ পরিবর্তন কখনো ইতিবাচক, আবার কখনো নেতিবাচক। সাধারণ জ্ঞান অর্জন যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি সহজে অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পথও খুলে গেছে। যোগাযোগ হয়ে পড়ছে যন্ত্রকেন্দ্রিক। বলা হয়ে থাকে, অনেকেই একসঙ্গে বসবাস করলেও তথ্য আদান-প্রদান করেন যন্ত্রের মাধ্যমে। এর ফলে মাধ্যমবিহীন যোগাযোগ ও সম্পর্ক ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের একটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এখানে বাস্তবিক অর্থে কোনো বিধি-নিষেধের তোয়াক্কা করতে হয় না। প্রয়োজনে নিজের পরিচয় গোপন রেখেই সব কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়। কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার নির্দিষ্ট কোনো সীমাবদ্ধতা আরোপ করলেও বিকল্প প্রযুক্তির মাধ্যমে তা এড়িয়ে যাওয়াও সম্ভব হয় এ জগতে। তবে বাস্তবতা হলো, ভার্চুয়াল জগতে একজন ব্যবহারকারী যে স্বাধীনতা ভোগ করেন, তা আসলে প্রকৃত কোনো স্বাধীনতা নয়। এর মধ্যদিয়ে একজন ইউজার কেবল মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে স্বস্তি লাভ করতে সক্ষম হন।
ভার্চুয়াল জগত : সম্ভাবনা ও শঙ্কা-১

ভার্চুয়াল জগত হচ্ছে এমন এক জগত যেখানে মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটে কম্পিউটার, মোবাইল তথা যন্ত্রের সহযোগিতায়। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড বা ভার্চুয়াল জগত পরিভাষাটি প্রথমবার ব্যবহার করেন উইলিয়াম গিবসন। তিনি হচ্ছেন সায়েন্স ফিকশনের বিখ্যাত লেখক। মানুষে-মানুষে যে যোগাযোগ ও লেনদেন তা বাস্তব জগতের বিপরীতে বিশ্বজনীন এবং এখানে একজন ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখতে পারে। এই জগতের নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি, তা সম্পর্কে একটু চিন্তা করলেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল ও চ্যাটরুমের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে তৎপরতা চালান।

ইন্টারঅ্যাকশন বা মিথস্ক্রিয়া হচ্ছে ভার্চুয়াল জগতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেখানে একইসঙ্গে পরস্পরকে দেখা যায়, কথা বলা যায়, লিখে বা না লিখে ভাব প্রকাশ করা যায়। রেডিও, টিভি ও পত্র-পত্রিকার মতো গণমাধ্যমে যা এত ব্যাপকভাবে সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে এই জগতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। তথ্য ও যোগাযোগ সংক্রান্ত প্রযুক্তির সহযোগিতায় এসব ঘটনা ঘটছে। ভার্চুয়াল জগত মানুষের সামনে এমন সব দিগন্ত খুলে দিয়েছে, যা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো সম্ভব। ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও এর বিপদের মাত্রাও কম নয়। এই জগতে তৎপর সব শ্রেণির মানুষেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বাস্তব জগতের মতো ভার্চুয়াল জগতেও তৎপর রয়েছে নানা পর্যায়ের অপরাধী। যারা ভালো মানুষের ছদ্মবেশে প্রতিনিয়ত মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। কখনো হাতিয়ে নিচ্ছে মানুষের সর্বস্ব। অনেক দুষ্টু স্বভাবের পুরুষ নারীর নাম ব্যবহার করে সরল মেয়েদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ধোকা দিচ্ছে।

উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন। অনুন্নত দেশগুলো অন্যের ওপর প্রভাব ফেলতে খুব একটা সক্ষম নয়। তবে এসব দেশ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উন্নত দেশগুলোর মাধ্যমে প্রভাবিত হয়। তবে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে, তা হলো ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের কারণে পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। পারস্পরিক ঘনিষ্ঠতা বিনষ্ট হচ্ছে। বর্তমানে যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, তা হলো তরুণ বয়সীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে মোবাইলের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে সময় ব্যয় করাকে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে পারিবারিক আড্ডায় বসার প্রবণতা কমে গেছে। শুধু তাই নয়, ভার্চুয়াল জগত মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। ভারতের বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ অ্যান্ড নিউরো সায়েন্স’র গবেষকদের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অত্যধিক পরিমাণে ইন্টারনেট ব্যবহারের ফলে নষ্ট হচ্ছে মানুষের ঘুমের সময়। আর সেই সময়টা আবার ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সোশ্যাল সাইটের নেশা প্রতিদিন গড়ে কেড়ে নিচ্ছে একেকজন ইউজারের ১০০ মিনিটের ঘুম। আর এই ঘটনা ঘটছে তাদের অজান্তেই।

ঐ গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ইন্টারনেটের নেশার কারণে ঘুম থেকে উঠতেও একেক জনের গড়ে দেরি হয় প্রায় ৯০ মিনিট। চিকিৎসকদের মতে, এভাবে দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে হৃদরোগ এবং অ্যাংজাইটির সমস্যা। এর আগে ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব কম বয়সী রোগী হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের ৯০ শতাংশই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে পারে না। এর ফলে এটা স্পষ্ট যে, ভার্চুয়াল জগত আমাদের জীবনের প্রতিটি অঙ্গনে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল জগত আমাদের জন্য যেমন নানা সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে, ঠিক তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছে বিপদের আশঙ্কা। একটু অসতর্কতা ও অসচেতনতা বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

পর্ব-২ :
“ভার্চুয়াল জগত: সম্ভাবনা ও শঙ্কা” শীর্ষক ধারাবাহিক প্রবন্ধের এ পর্বে ‘পরিবারের ওপর ভার্চুয়াল জগতের প্রভাব’ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

ইন্টারনেটভিত্তিক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের পেছনে মানুষ এখন অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে। আমরা বলছি না, এসবের প্রয়োজন নেই। কিন্তু এর ব্যবহার হচ্ছে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি। পরিবারের সদস্যরা ইন্টারনেটের পেছনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করায় বাবা-মায়ের সঙ্গে সন্তানের দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে। দূরত্ব বাড়ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেও। তরুণদের মাঝেই ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ঝোঁক-প্রবণতা তুলনামূলক বেশি। এ কারণে তরুণ সমাজের মধ্যে একধরনের আত্মকেন্দ্রিকতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি আসক্ত তরুণরা এখন আর আগের মতো এক জায়গায় বসে গল্প-গুজব করতে খুব একটা আগ্রহী নয়। এর ফলে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও মনের টান কমে যাচ্ছে।

পরিবারের সদস্যদের মধ্যে মনের দূরত্ব বাড়লে পরিবারের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে তালাকের মতো ঘটনা বেড়ে যায় এবং পরিবারের বিভিন্ন প্রজন্মের সদস্যদের মধ্যে অমিল ও মতবিরোধ আর সহনীয় পর্যায়ে থাকে না। পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও পারিবারিক সহিংসতা কমছে না। এর কারণ হচ্ছে, পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও আলোচনার অভাব। এর ফলে তাদের মধ্যে প্রত্যাশিত সহমর্মিতা দেখা যায় না এবং ছোটখাটো বিষয়েও ঝগড়া লেগে যায়। বর্তমানে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ আলোচনা ও গল্প-গুজবের স্থান দখল করে নিচ্ছে ভার্চুয়াল জগত। এ অবস্থায় পারিবারিক কাঠামোকে দৃঢ় ও শক্তিশালী রাখতে ভার্চুয়াল জগতের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা জরুরি হয়ে পড়েছে।

দূরত্ব বাড়ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে
দূরত্ব বাড়ছে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে

যেমনটি এর আগেও আমরা আলোচনা করেছি, বর্তমানে পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যম হয়ে উঠেছে ভার্চুয়াল জগত। এ কারণে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে জীবন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাপক পার্থক্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বড়দের অভিজ্ঞতা ও নির্দেশনা অনেকের কাছেই আগের মতো গুরুত্ব পাচ্ছে না। আবেগের বশবর্তী হয়ে সঙ্গী নির্বাচনের প্রবণতাও দিনদিন বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে স্বামী বা স্ত্রী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক দিকগুলো বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না। অনভিজ্ঞ তরুণ-তরুণীরা জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়ায় তালাক বা বিচ্ছেদের মতো ঘটনা অনেক বেড়েছে। ইন্টারনেটভিত্তিক কথোপকথন কখনোই পারিবারিক বৈঠকগুলোর বিকল্প হতে পারে না। পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ভালোবাসা ও আকর্ষণ হচ্ছে পবিত্র। এই ভালোবাসা ও আকর্ষণের ভিত্তিতেই পারিবারিক সুখ নিশ্চিত হতে পারে।

আমরা ভার্চুয়াল জগতের প্রতি অতি আকর্ষণ ও অতি নির্ভরতার কারণে নানা সমস্যা সৃষ্টি হওয়া নিয়ে কথা বলছি। তবে একইসঙ্গে ভার্চুয়াল জগতের প্রতি নির্ভরতা সৃষ্টির পেছনে যেসব বিষয় কাজ করে, সেগুলোও চিহ্নিত করতে হবে। একটি পরিবারের অভিভাবকবৃন্দ অর্থাৎ বাবা-মা উভয়ই যখন চাকরিজীবী হন, তখন তারা সন্তানদেরকে বেশি সময় দেন না বা চাইলেও দিতে পারেন না। এ অবস্থায় সন্তানেরা একাকিত্বে ভোগে। তারা সময় কাটাতে ভার্চুয়াল জগতের আশ্রয় নেয়। ইন্টারনেটে ঢুকে নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কাঙ্খিত বন্ধু-বান্ধবীর খোঁজ করতে থাকে। বড়দের পরামর্শ ছাড়াই এ ধরনের জগতে প্রবেশ করার কারণে কখনো কখনো বড় ধরণের ধোঁকা খায় তারা।

ক্লাসে মন নেই শিক্ষার্থীদের
ক্লাসে মন নেই শিক্ষার্থীদের

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যুক্ত হওয়া এখন এতটাই সহজ যে, সব বয়সের মানুষই সেখানে তৎপরতা চালাতে পারে। এ অবস্থায় পরিবারের অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি। বাবা-মা’র উচিত সন্তানদের জন্য কিছু সময় ব্যয় করা, যাতে তারা একাকিত্ব অনুভব না করে। বর্তমান যুগের ব্যস্ত জীবন পদ্ধতিতে বাবা-মায়েরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যে ভুলটি করেন, তাহলো সন্তানকে তারা সব কিছুই দেন শুধু সময় ছাড়া। বাবা-মা সন্তানের জন্য বাড়ি-গাড়ি কেনেন, ভালো স্কুলে ভর্তি করেন, ভালো খাবার ও পোশাক দেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে যে সময় কাটানো দরকার, তাদেরকে যে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেয়া দরকার সে কথা ভুলে যান। সন্তানরা স্কুল-কলেজে গিয়ে কী করছে, তার বন্ধু কে অথবা ইন্টারনেটে সে কাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তুলছে সেসব তথ্য বাবা-মায়েরা অনেক সময়ই জানেন না। এর ফলে বাবা-মায়ের অজান্তেই অনেক দূর্ঘটনা ঘটে যায়। এ ধরনের প্রবণতা বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মানুষের মতো ইরানিদের মধ্যেও দেখা যায়। এ কারণে এ নিয়ে এ দেশে ব্যাপক গবেষণা হচ্ছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে পরিচালিত এক জরিপে দেখা যাচ্ছে, ইরানের তেহরান, মাশহাদ, ইস্ফাহান, শিরাজ ও গিলান প্রদেশে বিয়ের প্রথম তিন বছরের মধ্যে যেসব তালাকের ঘটনা ঘটে এর ১৭ শতাংশই ঘটে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাবে। জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাস্তবতার চেয়ে আবেগকে বেশি গুরুত্ব দেয়ার কারণেই পরবর্তীতে বিচ্ছেদের ঘটনা বেশি ঘটে বলে গবেষকরা জানিয়েছেন। অনেকেই আবার জীবনযাপনের সঠিক পদ্ধতি জানে না বা জানলেও তা প্রয়োগ করে না। এ কারণেও স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তালাকের ঘটনা ঘটে থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, বিয়ের পর স্বামী বা স্ত্রী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। সাংসারিক সমস্যার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই কৃত্রিম সুখের সন্ধান করেন অনেক মানুষ।

ভার্চুয়াল জগত : সম্ভাবনা ও শঙ্কা-২এ অবস্থায় কেউ কেউ সুস্থ বিনোদনের সন্ধান করতে গিয়ে বিপথে চলে যান। স্বামী বা স্ত্রীর সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে তখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সময় কাটানো বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। এরপর তা এক ধরনের নেশায় পরিণত হয়। ফলে সাংসারিক যে ঝামেলা সহজেই মিটে যেতে পারত, তা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও জটিল হয়ে পড়ে। তবে মনে রাখতে হবে, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম আমাদের জন্য নানা সুযোগ এবং সম্ভাবনাও তৈরি করেছে। আমরা কীভাবে, কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করছি তার ওপর নির্ভর করে আমরা এই জগত থেকে উপকৃত হবো নাকি বিপদগ্রস্ত হবো। বাস্তবতা হলো, ভার্চুয়াল জগতকে এড়িয়ে যাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কাজেই এ জগতকে মেনে নিয়ে সচেতনভাবে তা ব্যবহার করতে হবে।

পর্ব-৩ :
গত পর্বে আমরা বলেছি, ইন্টারনেট বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোর প্রতি আসক্তির কারণে অনেকেই পরিবারে সময় দেয়ার চেয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে সময় কাটানোকে বেশি আকর্ষণীয় মনে করে। এসব কারণে অনেক ক্ষেত্রেই স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কে টানাপড়েন দেখা দেয়। এমনকি সাংসারিক যে ঝামেলা সহজেই মিটে যেতে পারতো, ইন্টারনেটের প্রতি আসক্তির কারণে তা আরও জটিল হয়ে পড়ে।

সাধারণত প্রতিটি জিনিসের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক থাকে। শুরুতে ইন্টারনেট ব্যবহারের উদ্দেশ্যও খারাপ ছিল না। কিন্তু এখন অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে সেটা ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগের পর্বেও বলেছি, আমরা কখনোই ইন্টারনেট ব্যবহারের বিপক্ষে নই। তবে ব্যবহারের একটা সীমা-পরিসীমা থাকতে হবে। সেটা মেনে চলতে হবে। সঠিক উপায়ে ব্যবহার করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় থাকবে, যাতে পরিবারের সদস্যদের জন্য নির্ধারিত সময়ে ইন্টারনেট ভাগ বসাতে না পারে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে পরিবার হচ্ছে একটি সমাজের মূলভিত্তি। প্রতিটি পরিবারের ভূমিকা ও তৎপরতা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গোটা সমাজকেই প্রভাবিত করে। ফলে সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে পারিবারিক কাঠামো টিকিয়ে রাখতে হবে। সুস্থ’ সমাজ গড়তে হলে সুস্থ’ পরিবার গঠন করতে হবে। কিন্তু বর্তমানে সমাজ বিজ্ঞানীরা ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতকে সুস্থ’ পরিবার গঠনের পথে অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে মনে করছেন।

তারা বলছেন, ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়া একটি পরিবারের সদস্যদের নিজেদের মধ্যে এবং বাইরের জগতের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলে। পরিবার ও সমাজে বিদ্যমান সম্পর্কের ধরণকেই পুরোপুরি পাল্টে দিচ্ছে ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগত। সমাজবিজ্ঞানীরা বারবারই বলছেন, সমাজকে টিকিয়ে রাখতে হলে সমাজে বিদ্যমান সুস্থ’ সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে এবং এ বিষয়ে সঠিক পরিকল্পনা থাকতে হবে। কারণ, ইন্টারনেটের প্রতি অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার পরিণামে পরিবার ও সমাজে সাংস্কৃতিক অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেকের মধ্যে ইসলামি সংস্কৃতি ও মূল্যবোধকে ধারণ করার মন-মানসিকতা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারণ হলো, ইন্টারনেট তথা ভার্চুয়াল জগতের মাধ্যমে সহজেই বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঘটছে। এর ফলে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অল্প বয়সীরা। কারণ, পরিবার ও সমাজ ব্যবস্থাকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার আগেই তারা ইন্টারনেটের কারণে এমন এক নিয়ন্ত্রণহীন জগতে প্রবেশ করছে যেখানে ভালো-মন্দের মধ্যে কোনো ধরণের সীমারেখা টানা হয়নি। ভার্চুয়াল জগত বা ইন্টারনেটে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব বেশি থাকায় তা মুসলিম সংস্কৃতির জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

মোবাইলের মাধ্যমে ইন্টারনেটের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় শিশুরা বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অনেক সময় শিশুরা মোবাইলের বাটন চাপতে চাপতে নিজের অজান্তেই ইন্টারনেটে সংযুক্ত হয়ে পড়ছে এবং শিশুদের জন্য অনুপযোগী ছবি তথা দৃশ্য সামনে ভেসে উঠছে। তারা এমন সব অশালীন দৃশ্য দেখছে যা ইন্টারনেটের সঙ্গে সংযুক্ত না হলে পূর্ণ বয়স্ক হওয়ার আগে তাদের কল্পনাতেও আসত না। এ ক্ষেত্রে পরিবারে বড়দের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। শিশু-কিশোররা ইন্টারনেট ব্যবহার করলেও তাতে বড়দের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। প্রয়োজনে ফিল্টারিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে যাতে শিশু-কিশোরদের অনুপযোগী কোনো ছবি, দৃশ্য ও লেখা তাদের সামনে প্রদর্শিত না হয়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের মতো অনেক দেশের শিশুদেরকে ইন্টারনেটের মাধ্যমে জঙ্গিবাদে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামকে অপব্যাখ্যার মাধ্যমে শিশু-কিশোরদেরকে সহিংসতার দিকে টানা হচ্ছে। এর মাধ্যমে একটি শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে চলাকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। জীবন ও সমাজ সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানার্জনের আগেই বিপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

ভার্চুয়াল জগত : সম্ভাবনা ও শঙ্কাইন্টারনেট বা ভার্চুয়াল জগতে সব সময় সক্রিয় থাকায় অনেকেই রাত জেগে এর পেছনে সময় ব্যয় করছে। এর ফলে বিশ্রাম ও ঘুমের জন্য নির্ধারিত সময় অপচয় হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে শরীর-মন ও পরিবারের ওপর। শুধু তাই নয়, স্থান ও কালের সীমাবদ্ধতা না থাকায় অনেকে বাসায় বসে অফিসের কাজ করছে, ব্যবসা-বাণিজ্য চালাচ্ছে। অনেকে অফিসের পাশাপাশি বাসাতে গিয়েই অফিসের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকছে। এর অনেক ভালো দিক থাকলেও চূড়ান্তভাবে পরিবারের জন্য নির্ধারিত সময় কমে যাচ্ছে। পরিবারের সদস্যরা এভাবেই নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় ও কথোপকথনের সুযোগ হাতছাড়া করছে। পরিবারের অভিভাবক যখন পরিবারকে যথেষ্ট সময় না দিয়ে অন্যভাবে সময় কাটান, তখন পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্য তা অত্যন্ত কষ্টকর বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাদের মধ্যে একধরনের হতাশা কাজ করে।

অনেক ক্ষেত্রেই হতাশা থেকে ক্ষোভ জন্ম নেয় এবং পরিবারের অভিভাবকের প্রতি আকর্ষণ ও আনুগত্য কমে যায়। আর এ ধরনের প্রবণতা একবার শুরু হলে তা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং কখনো কখনো পরিবার ভেঙেও যায়। পরিবার হলো মানসিক প্রশান্তি অর্জনের সবচেয়ে নিরাপদ ও নির্ঝঞ্জাট ক্ষেত্র। মানসিক প্রশান্তির এ ক্ষেত্রটিকে কোনোভাবেই নষ্ট করা ঠিক নয়। এ কারণে আমাদের সবাইকে পরিবার রক্ষায় সোচ্চার হতে হবে। পরিবারকে সময় দিতে হবে। একসঙ্গে বসে কথা বলতে হবে, সুখ-শান্তি ও দুঃখ-কষ্ট ভাগাভাগি করে নিতে হবে। অকারণে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে ব্যস্ত না থেকে পরিবার নিয়ে ব্যস্ত থাকলে সন্তানদের ভবিষ্যৎ সুন্দর ও সুখময় হবে।   (চলবে….)

লেখক: সাহিত্যিক ও চেয়ারম্যান
আবাবিল হজ্জ্ব গ্রুপ

প্রতিউত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন