মোঃ মনিরুজ্জামান: বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৪নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- সংবিধানের তৃতীয় ভাগের অধিকার বলবৎ করার জন্য সংবিধানের ১০২নং অনুচ্ছেদের (১)নং দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগে মামলা করার অধিকার দেওয়া হলো। তৃতীয় ভাগের অধিকার অর্থাৎ মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য ১০২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে যে মামলা দায়ের করা হয়, তাকে রীট (Writ) বলে।

রীট (Writ):
রীট (Writ) অর্থ আদালতের লিখিত আদেশ। রীট হলো হাইকোর্টের এমন এক আদেশ, যার মাধ্যমে হাইকোর্ট কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কোন কাজ করতে বা কোন কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়।

রীটের ইতিহাস:
রীট শব্দটির উৎপত্তি ইংল্যান্ডে। রীট পিটিশন প্রয়োগ প্রথম চালু হয় ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ডের রাজা বা রানী তাদের কর্মচারীদের কাজকর্ম করতে বাধ্য করার জন্য অথবা কোন অবৈধ কাজ করা থেকে বিরত রাখার জন্য রীট জারি করতো। রাজা বা রানীর এই বিশেষ অধিকার পরবর্তীতে নাগরিকদের মধ্যে চলে আসে। নাগরিকরা রাজা বা রানীর কাছে সরকারী কর্মচারিদের বিরুদ্ধে রীটের আবেদন করতো এবং রাজা বিশেষ অধিকার বলে সেই কর্মচারিদের উপর রীট জারি করতো। আবেদনের প্রেক্ষিতে রীট আদেশ প্রদান করতেন রাজসভার বিচারকরা এবং এটি ছিল রাজার পক্ষ থেকে ঐ আদালতের বা রাজসভার বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ দায়িত্ব।

কোন আদালত রীট জারি করতে পারে:
সংবিধানের ১০২(১)নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে কোন সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে সংবিধানের তৃতীয় ভাগের যেকোন একটি প্রতিষ্ঠা করার জন্য যেকোন ব্যক্তিকে হাইকোর্ট নির্দেশ বা আদেশ দিতে পারবে। অর্থাৎ রীট জারির এখতিয়ারবান আদালত হলো মহামান্য হাইকোর্ট। হাইকোর্ট বিভাগে শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্রে আদি এখতিয়ার রয়েছে আর এই ক্ষেত্রটি হচ্ছে রীট।

কোন ক্ষেত্রে রীটের আবেদন করা যায়:
বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২(১)নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোন ব্যক্তির সংবিধানের তৃতীয় ভাগের কোন অধিকার অর্থাৎ মৌলিক অধিকার যদি কেউ খর্ব করে, তাহলে উক্ত ব্যক্তি সেই অধিকার আদায়ের জন্য হাইকোর্ট বিভাগে রীট পিটিশন দায়ের করতে পারবে।
আবার সংবিধানের ১০২(২)নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, যদি কোন ব্যক্তির অধিকারের ব্যপারে আইনের কোথাও প্রতিকারের কথা না থাকে তাহলেও রীট আবেদন করতে পারবে।

রীটের প্রকারভেদ:
বাংলাদেশ সংবিধানে পাঁচ ধরনের রীটের কথা বলা হয়েছে।
(১) Writ of Habeas Corpus (হেবিয়াস কর্পাস)
(২) Writ of Mandamus (ম্যান্ডামাস)
(৩) Writ of Prohibition (প্রহিবিশন)
(৪) Writ of Cerciorari ( ছারসিওরারি)
(৫) Writ of Quo Warranto (কুয়া ওয়ারেন্টো)

Writ of Habeas Corpus (হেবিয়াস কর্পাস):
হেবিয়াস কর্পাস অর্থ কোন ব্যক্তিকে আদালতের সামনে উপস্থিত করা। এটা হাইকোর্টের একপ্রকার আদেশ। যার মাধ্যমে কোন ব্যক্তিকে আদালতের সামনে উপস্থিত করার আদেশ দান করা হয়। কোন ব্যক্তিকে বে-আইনিভাবে আটক করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য হেবিয়াস কর্পাসের আবেদন করা হয়। কোন ব্যক্তিকে সরকার বা অন্য কেউ যদি আটক করে, তাহলে তাকে কি কারণে আটক করা হয়েছে এই কারণ দর্শানোর জন্য বন্দিকে আদালতের সামনে উপস্থিত করার যে আদেশ দেয়া হয়, সেটাই হেবিয়াস কর্পাস। এই রীটের উদ্দেশ্য মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং কোন ব্যক্তিকে যেন অবৈধভাবে আটক না করা হয়। বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২নং অনুচ্ছেদের ২নং উপঅনুচ্ছেদের খ-দফার অ-উপদফায় হাইকোর্টকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, হাইকোর্ট কোন ব্যক্তির আবেদনক্রমে আইনসঙ্গত কর্তৃত্ব ছাড়া বা বেআইনি উপায়ে কোন ব্যক্তিকে প্রহরায় আটক রাখা হয় নাই বলে যাতে উক্ত বিভাগের কাছে সন্তোষ জনকভাবে প্রতিয়মান হতে পারে, সেজন্য প্রহরায় আটক উক্ত ব্যক্তিকে উক্ত বিভাগের সামনে আনার নির্দেশ দিয়ে আদেশ দান করতে পারবে। হাইকোর্ট ফৌজদারি কার্যবিধির ৪৯১ ধারাতেও হেবিয়াস কর্পাসের নির্দেশ দিতে পারে। তবে রীট আবেদন সংবিধানের ১০২নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী করতে হবে।

Writ of Mandamus (ম্যান্ডামাস):
ম্যান্ডামাস বলতে বোঝায় উচ্চ আদালত কর্তৃক নিম্ন আদালতের উপর হুকুম জারি। এই রীটের মাধ্যমে হাইকোর্ট কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদালতকে আইনগত কাজ করার নির্দেশ দিতে পারে। কোন ব্যক্তি বা আদালত যদি কোন কাজ করতে অস্বীকার করে যে কাজ করতে সে আইনগতভাবে বাধ্য, তাকে সেই কাজ করতে আদালত যে নির্দেশ দেন তাই Mandamu(ম্যান্ডামাস) রীট। বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২নং অনুচ্ছেদের ২নং উপঅনুচ্ছেদের ক-দফার অ-উপদফায় হাইকোর্টকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা আছে, প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোন দায়িত্ব পালনে কর্মরত কোন ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা তার করণীয় কাজ করার জন্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিতে পারবেন।

Writ of Prohibition (প্রোহিবিশন):
প্রোহিবিশন বা নিষেধাজ্ঞা বলতে আদালত কর্তৃক কোন কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশকে বোঝায়। এই রীটের মাধ্যমে হাইকোর্ট কোন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা আদালতকে কোন কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতে পারে, যে কাজ থেকে বিরত থাকতে সে আইনগতভাবে বাধ্য। বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২নং অনুচ্ছেদের ২নং উপঅনুচ্ছেদের ক-দফার অ-উপদফায় হাইকোর্টকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা আছে, প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়াবলীর সাথে সংশি¬ষ্ট যেকোন দায়িত্ব পালনে কর্মরত কোন ব্যক্তিকে আইনের দ্বারা অনুমোদিত নয় এমন কোন কাজ করা থেকে বিরত রাখার জন্য হাইকোর্ট আদেশ দিতে পারেন।

Writ of Cerciorari (ছারসিওরারি):
হাইকোর্ট বিভাগের অধ:স্তন যেকোন আদালতের বিচার কাজের বৈধতা বা অন্য কোন বিধান পরীক্ষা করার জন্য এই রীট জারি করা হয়। কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা ব্যক্তি যদি তার আইনগত ক্ষমতার বাইরে কোন কাজ করে থাকে তাহলে আদালত যে আদেশের মাধ্যমে তা নাকচ করে দেয়, তাকে Cerciorari(ছারসিওরারি) রীট বলে।

Prohibition(প্রোহিবিশন) এবং Cerciorari(ছারসিওরারি) এর মধ্যে পার্থক্য হলো Prohibition(প্রোহিবিশন)-এ কোন কাজ করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিবে এবং Cerciorari(ছারসিওরারি) তে কোন কাজ করা হলে সেই কাজকে অবৈধ বলবে। বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২নং অনুচ্ছেদের ২নং উপঅনুচ্ছেদের ক-দফার আ-উপদফায় হাইকোর্টকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্র বা কোন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের বিষয়ের সাথে সংশ্লিষ্ট যেকোন দায়িত্ব পালনে করা কাজ আইনসঙ্গত না হলে আইনসঙ্গত কর্তৃত্ব ছাড়া করা হয়েছে বলে হাইকোর্ট ঘোষণা করতে পারবে।

Writ of Quo Warranto (কুয়ো ওয়ারেন্টো):
কোন ব্যক্তি যদি কোন সরকারী পদের দাবি করেন যে পদের যোগ্যতা তার নেই তাহলে তিনি কেন এমন দাবি করেছেন তার কারণ বলার জন্য আদালত যে নির্দেশ দেন, সেটাই হলো Quo Warranto(কুয়া ওয়ারেন্টো) রীট। বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২নং অনুচ্ছেদের ২নং উপঅনুচ্ছেদের খ-দফার আ-উপদফায় হাইকোর্টকে এই ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এখানে বলা আছে, কোন সরকারী পদে দখল বা দখল বলে বিবেচিত কোন ব্যক্তিকে তিনি কোন কারণে এমন দাবি করছেন তা বলার জন্য হাইকোর্ট আদেশ দিতে পারেন।

লেখক: শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

 

প্রতিউত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন